আমাদের জীবন


দুটো জীবনের ভিন্ন গন্তব্য 

 রোজার দিন একটি শান্ত সকালে ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হয়েছি, আমি সিএনজির পেছনের সিটে ডানপাশে বসে আছি,আর আমার বাম পাশে দু'জন মানুষ,----যাদের বয়সের ভারে চামড়া কুঁচকে গেছে,কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে এখনো তাদের মাঝে এক অমিলন শৈশব রয়ে গেছে। 


মাঝখানে বৃদ্ধ আঙ্কেল,গায়ের রঙ কিছুটা তামাটে,পরনে সাদা পাঞ্জাবি, কপালে ভাঁজ। 

সিএনজির বাম পাশে বসা গারো উপজাতির বৃদ্ধ কাকিমা।পরনে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের ছোঁয়া। লাল ও নীল রঙের নকশা করা আদবাসীদের শাল গায়ে জড়ানো। মাথায় সাদা চুলে রঙ করা,চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।

সিএনজি যখন চলতে শুরু করলো, সাধারণ কুশল বিনিময়ের একপর্যায়ে আঙ্কেল যখন কাকিমার আদি বাড়ি এবং নাম জিজ্ঞেস করলেন মূহুর্তের মধ্যেই তাদের মাঝে আবেগঘন পরিবেশ তৈরী হলো। বৃদ্ধ আঙ্কেলের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।

জীবনের প্রথম পাতা

একটি নাম----জ্যোতি, শৈশবের একটি স্মৃতি। ব্যস____এটুকুই যথেষ্ট ছিলো। প্রায় ষাটোর্ধ বছরের ধুলোজমা স্মৃতির ডায়েরিটা খুলে ফেলার জন্য। 

মুরব্বী তারা দুজনেই শৈশবের সহপাঠী, আজ থেকে প্রায় ৫৫-৬০ আগে গ্রামের স্কুলে একসাথে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। বৃদ্ধ আঙ্কেল মুসলিম আর কাকিমা গারো সম্প্রদায়ের হলেও সেই সময়ের ধর্ম আর গোত্র তাদের  মাঝে দেওয়াল তুলতে পারেনি।

কাকিমা আবেগ আপ্লূত হয়ে বললেন" মনে আছে সেই বিষ্টি তলার কথা,যেখানে টিফিনের সময় আমরা গোল হয়ে বসে গল্প করতাম? শমর আলী খুব দুষ্টু ছিলো, সবসময় আমাদের বিরক্ত করতো। আচ্ছা! ওই কি জীবিত আছে?

আঙ্কেলের শুকনো ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি, তবে নিমিষেই বিষাদে পরিণত হলো। তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,"আমার মনে থাকবেনা কেন! সব মনে আছে। তোমার বাবা যখন তোমাকে বড় স্কুলে ভর্তি করারনোর জন্য শহরে নিয়ে গেলো আমি তখন স্কুলের পিছনে নীদর পাশে একা একা বসে থাকতাম। ক্লাস শেষে এভাবেই বাড়িতে চলে যেতাম।

দুটো জীবনের ভিন্ন গন্তব্য -----------

অষ্টম শ্রেণির পর বৃদ্ধা কাকিমা পড়াশোনার জন্য শহরে চলে যান। তিনি জীবনের অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একজন রিটায়ার শিক্ষিকা হয়ে জীবন পারি দিচ্ছেন। তাঁর কথায় এখনো শিক্ষিত মার্জিত আভিজাত্য। 

অন্য দিকে বৃদ্ধ আঙ্কেলের জীবনের ডায়েরির ছিলো ভিন্ন, বাবার অসুস্থতা আর সংসারের অভাবের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তাঁর পড়াশোনার অধ্যায় ওখানেই শেষ ছিলো। যেই হাতের স্বপ্ন ছিলো উচ্চ শিক্ষার সেই হাতকেই ধরতে হয়েছিল লাঙ্গল আর সংসারের হাল। জীবন ও জীবিকার তাগিদে স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন গ্রামের খেটে খাওয়া সংগ্রামী মানুষ। 

সিএনজির গতির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিলো তাদের গল্প। কাকিমা তার শিক্ষকতার গল্প বলছিলেন আঙ্কেল তখন গভীর মমতা দিয়ে শুনছিলেন অতৃপ্তি নিয়ে। 

কাকিমা আঙ্কেলের খসখসে হাতের দিকে তাকি বললেন "অনেক কষ্ট করেছো জীবনে তুমি"।

আঙ্কেল মৃদু হাসলেন আর বললেন সবই কপালের লেখা।

তবে এতোদিন পর তোমারে দেইখা মনে হলো আমি এখনো সেই অষ্টম শ্রেণিতেই আছি। ধর্ম আলাদা জাত ভিন্ন, তবুও সেই ছোটবেলার টানটা এখনো রয়ে গেলো।


সিএনজি গন্তব্যের কাছাকাছি,,,,,এই দিকে আমি ভাবতে থাকলাম হয়তোবা একটু পরেই তারা দু'জন দু'দিকে চলে যাবে। হয়তোবা এই জীবনে আর কোনদিন দেখাও হবেনা তাদের মাঝে।আমার কাছে মনে হয়েছিলো ষাটোর্ধ বয়সের এই দুজন চৌদ্দ বছরের কিশোর-কিশোরী হয়ে গিয়েছিলেন সামন্য সময়ের জন্য। আমাদের জীবন আসলে অসমাপ্ত উপন্যাসের মতো যার শুরুটা চিত্তাকর্ষণ আনন্দময় হলেও শেষটা অপূর্ণ থেকে যায়।

------------তোফায়েল আহমাদ 

২৭/০২/২০২৬

দ্রঃ তাদের নাম এবং পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। 

হয়তোবা অনেকেই চিনে ফেলবে তাই।